বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের বাঁকগুলোতে এমন কিছু মানুষের দেখা মেলে, যাঁদের জীবন ও কর্ম একটি দেশ ও জাতির পরিচয়ের সাথে সমান্তরালভাবে মিশে যায়। তেমনই একজন বহুমাত্রিক ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব ছিলেন প্রয়াত মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস। আজ ২৫শে জানুয়ারি তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের ৪ঠা মার্চ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহামানব তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে একাধারে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা, সফল শিল্প উদ্যোক্তা এবং নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। দেশের টানে নিজের প্রাণ বাজি রেখে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর তিনি জাতির সেবায় যোগ দেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে। একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর কর্মজীবন ছিল সততা, সাহস ও শৃঙ্খলার এক অনন্য উদাহরণ। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আপসহীন ভূমিকা আজও পুলিশ প্রশাসনে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পকে বিশ্বদরবারে সুসংগঠিত করতে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দেশের 'সুয়েটার্স শিল্পের পথিকৃৎ' হিসেবে তাঁর হাত ধরেই এই খাতের বাণিজ্যিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়। বিজিএমইএ-র সভাপতি হিসেবে তিনি যখন দায়িত্ব পালন করেন, তখন বাংলাদেশের পোশাক খাত এক কঠিন সময় পার করছিল। বিশেষ করে, তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এ শিল্প থেকে শিশু শ্রম নির্মূলের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতাকে আমূল বদলে দিয়েছিল।

উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর প্রতিভা শুধু পোশাক শিল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের বীমা খাতকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রূপালী ইন্স্যুরেন্স ও সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড। আধুনিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকসেবার মাধ্যমে তিনি এই খাতকে একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আজ হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তার ভরসাস্থল।
ব্যক্তিজীবনে মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও মানবিক। প্রচারের আড়ালে থেকে তিনি অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে তাঁর অবদান ছিল অবারিত। বিশেষ করে তাঁর নিজ এলাকা কুমিল্লার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা যুগ যুগ ধরে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাবে।
২০২৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব আমাদের ছেড়ে চলে যান। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাইনি, হারিয়েছি এক দিকপালকে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, দেশপ্রেম এবং ত্যাগের মহিমা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস কোনো একক ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শ, যিনি শিখিয়েছেন কীভাবে দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে হয়।
আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
সাইফুদ্দিন ইমন
পরিচালক ( অপারেশন্স)
মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ফাউন্ডেশন।
You cannot copy content of this page